ভাদ্র পূর্ণিমা ও ভিক্ষুণী সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা: বুদ্ধের নারী মুক্তি ও সমমর্যাদা
বৌদ্ধ জগতে ভাদ্র পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম। এদিন ভগবান মহাকারুণিক তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ তাঁর বুদ্ধত্ব লাভের পাঁচ বছর পর বৈশালীতে ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক ও উপাসিকার চার স্তম্ভের মধ্যে মহান ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করেন। যেমন আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বুদ্ধ সারনাথে ভিক্ষু সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি ভাদ্র পূর্ণিমায় ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা ঘটে। এই দিনটি সমগ্র বৌদ্ধ জগতে ভিক্ষুণী সঙ্ঘের জন্মদিন বা স্থাপনা দিবস হিসেবে চিরস্মরণীয়।
বর্তমান পৃথিবীতে সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজ নারী-পুরুষের সমানতা ও সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। জ্ঞান, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার যুগে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা লাভ করেছেন। কিন্তু আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, ভগবান বুদ্ধ নারীদের সম মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বুদ্ধই একমাত্র মহামানব, যিনি নারীদের নিম্নস্তর থেকে উপরের সারিতে তুলে এনেছিলেন। তথাগত বুদ্ধের উদ্যোগে নারীরা ধম্মের আধ্যাত্মিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন, যা ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
ভগবান বুদ্ধের আগে নারীরা সমাজে নানা অবহেলা ও নিপীড়নের শিকার হতেন। তাদেরকে ধর্মের নামে দাসীর মতো ব্যবহার করা হতো এবং মানবাধিকারের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হতো। বুদ্ধ ভিক্ষুণী সঙ্ঘে নারীদের স্থান দিয়ে তাঁদের আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার প্রদান করেন। তিনি নারীদেরকে ‘অবলা’ বা অধিকারহীন রূপে দেখার প্রচলিত ধারাকে ভেঙে দেন এবং তাদেরকে স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা ও সমাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ প্রদান করেন।
ভিক্ষুণী সঙ্ঘে নারীরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা, ধ্যান ও সমাজকল্যাণে সক্রিয় হন। এই সঙ্ঘের সদস্যদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন ভগবানের বিমাতা মহারাণী মহাপ্রজাপতি গৌতমী, শাক্যরাজকুমারী রাহুলমাতা যশোধরা, রাজা বিম্বিসার মহীষী মহারাণী ক্ষেমা, অগ্রশ্রাবক সারিপুত্রের ছোট বোন চালা, উৎপলবর্ণা, ধীরা, পটাচারা, কৃশা গৌতমী, সুমনা, ধম্মা, সুমঙ্গলমাতা, অভয়মাতা ও অসংখ্য নারীরা। তারা ভিক্ষুণী সঙ্ঘের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন।
ভিক্ষুণী সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বুদ্ধ নারীদের সামাজিক স্বাধীনতারও পথ প্রশস্ত করেন। নারীরা ঘরের বা মহলের চার দেওয়ালে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তাদের কথা বলার অধিকার, ধর্মচর্চার সুযোগ এবং সমাজে সক্রিয় ভূমিকা প্রদানের মাধ্যমে বুদ্ধ নারী শক্তিকে বিকশিত করেছেন। বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক উদাহরণ ছিল উৎপলবর্ণা, যিনি ধর্মের সুব্যাখ্যান দিয়ে শ্রোতাদের বিমুগ্ধ করতেন।
ভিক্ষু ও ভিক্ষুণী সঙ্ঘের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, ভিক্ষুণী সঙ্ঘে নারীদের শান্তি, সমতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা ছিল উদাহরণস্বরূপ। নারীদের অপরাধ ও অশৃঙ্খলতার সংখ্যা কম, তাদের কর্মকাণ্ড সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বুদ্ধের পদক্ষেপ সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
তবে, ঐতিহাসিকভাবে ভিক্ষু সঙ্ঘের মধ্যে বিবাদ ও অশৃঙ্খল আচরণের কারণে বুদ্ধকে দশম বর্ষা পারিলেয়্য অরণ্যে অতিবাহিত করতে হয়েছে। ভিক্ষুদের জেদ, উশৃঙ্খলতা ও স্বেচ্ছাচারিতা সঙ্ঘে সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে বুদ্ধ ভিক্ষুদের উপর কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হয়। কিন্তু ভিক্ষুণী সঙ্ঘে এমন অশৃঙ্খলতার ঘটনা চোখে পড়ে না। এটি নারীদের শৃঙ্খলাবদ্ধতা, সততা এবং আধ্যাত্মিক উৎসর্গকে প্রতিফলিত করে।
ভিক্ষুণী সঙ্ঘে নারীরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা, ধর্মচর্চা এবং সমাজসেবায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। বুদ্ধ তাদের শৃঙ্খলা, সততা ও সমাজকল্যাণে উদ্বুদ্ধ করতেন। এটি নারী স্বাধীনতা, সামাজিক সমতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক ইতিহাস রচনা করে। ভাদ্র পূর্ণিমার দিনটি তাই নারীর মুক্তি, সমতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয়।
বুদ্ধের শিক্ষায় এদিনের মূল শিক্ষা হলো নিজের দোষ ও কর্তব্যের প্রতি নজর দেওয়া। অন্যের দোষে মনোযোগ না দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ ও সঠিক পথে পরিচালনা করাই ভাদ্র পূর্ণিমার শিক্ষা। “ন পরেসং বিলোমানি ন পরেসং কতাকতং। অত্তনো’ব অবেক্খেয্য কতানি অকতানি চ।” অর্থাৎ অন্যের দোষ বা কৃত্য যাচাই না করে নিজের দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই দিনে ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সমগ্র মানব সমাজে সমতা, স্বাধীনতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির বার্তা প্রচার করে। বুদ্ধের এই পদক্ষেপ আজও নারী শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। ভাদ্র পূর্ণিমা তাই শুধু একটি পূর্ণিমা নয়, এটি নারীর মুক্তি, মানবাধিকার এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার চিরন্তন প্রতীক।

No comments:
Post a Comment