ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ইস্যুটি এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নসহ প্রবাসী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও এটি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দখলে থাকা ৫.৩১ বিঘা জমির দাবি থেকে সরে আসার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিভক্তি দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মহলে।
ঐতিহাসিক ভিত্তি ও আইনি অবস্থানঐ তিহাসিক নথি অনুযায়ী
১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে ভাওয়াল রাজপরিবারের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় ২০ বিঘা জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করেছিলেন। ১৯০৮ সালের এক রেজিস্ট্রিকৃত দলিল অনুযায়ী, সেবায়েতদের এই জমি ভোগদখলের অধিকার থাকলেও তা বিক্রি বা হস্তান্তরের কোনো আইনি ক্ষমতা নেই। সিএস ও এসএ জরিপেও এই জমির দাগ নম্বর ও সীমানা স্পষ্টভাবে দেবোত্তর হিসেবে সংরক্ষিত।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: আংশিক সমঝোতার প্রস্তাব
সম্প্রতি কিছু সংগঠন ভূমিমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছে যে, বুয়েটের দখলে থাকা ৫.৩১ বিঘা জমির দাবি পরিত্যাগ করে বাকি ৮.৫৯ বিঘা জমি উদ্ধারে মনোযোগ দেওয়া হোক। এই প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে এখন উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
সমর্থনকারীদের যুক্তি:
বাস্তব পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ না বাড়িয়ে সমঝোতার মাধ্যমে অন্তত অবশিষ্টাংশ পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। বিকল্প হিসেবে বুয়েট ক্যাম্পাসে হিন্দু ছাত্রাবাস বা স্মৃতি মন্দির নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদের যুক্তি: দেবোত্তর সম্পত্তি শাস্ত্র ও আইন অনুযায়ী অ-হস্তান্তরযোগ্য। আংশিক দাবি ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হলো মূল আইনি লড়াইকে দুর্বল করে দেওয়া। তাদের মতে, মৌখিক বা লিখিত—যেকোনো সমঝোতা ভবিষ্যতে পুরো জমির মালিকানা হারানোর পথ প্রশস্ত করতে পারে।
আইনি জটিলতা ও পরামর্শ
আইনজীবীদের মতে, যেহেতু মামলার নথিতে পুরো ১৩.৯ বিঘা জমিকে বেদখল হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাই যেকোনো ধরনের সমঝোতা আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া দানপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করলে বিভ্রান্তি কমবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এসভিএস-বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শ্রী পরিমল চন্দ্র রায় রাণা।
জাতীয় মন্দিরের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বদ্ধ ঘরে না নিয়ে বরং উন্মুক্ত আলোচনা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়ার দাবি উঠেছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে—ঐতিহাসিক এই দেবোত্তর সম্পত্তির ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে।

No comments:
Post a Comment