সাইবার অপরাধীরা এখন এমন এক নতুন কৌশল ব্যবহার করছে, যেখানে আপনার ফোনে ম্যালওয়্যার ইনস্টল করারও প্রয়োজন হয় না, পাসওয়ার্ড চুরি করতে হয় না, এমনকি অ্যাকাউন্ট হ্যাকও করতে হয় না। মাত্র একটি ভুল ক্লিকের মাধ্যমেই আপনার মোবাইল থেকে আন্তর্জাতিক নম্বরে একের পর এক এসএমএস পাঠানো হচ্ছে, আর সেই বিল গুনতে হচ্ছে ব্যবহারকারীকেই। এই প্রতারণার নাম ‘এসএমএস পাম্পিং অ্যাটাক’।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে এই ধরনের সাইবার প্রতারণা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ ব্যবহারকারীদের অসতর্কতার সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক কারণ অনেকেই বুঝতেই পারেন না কখন তাদের ফোন ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক এসএমএস পাঠানো হয়েছে।
কী এই ‘এসএমএস পাম্পিং অ্যাটাক’?
ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় “আপনি কি রোবট?” ধরনের যাচাইকরণ পেজ বা ক্যাপচার মুখোমুখি হয়েছেন। আগে যেখানে বিকৃত লেখা টাইপ করতে হতো, এখন সেখানে ছবি নির্বাচন বা ছোটখাটো যাচাই প্রক্রিয়া দেখা যায়। সাইবার অপরাধীরা এখন এই পরিচিত ব্যবস্থাকেই ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ক্লিকফিক্স’ নামে পরিচিত একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে ভুয়া ক্যাপচা পেজ তৈরি করা হচ্ছে। এসব পেজ দেখতে অনেকটাই আসল ওয়েবসাইটের মতো হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ব্যবহারকারীদের সেখানে একটি বাটনে ক্লিক করতে বলা হয়, যা মূলত তাদের ফোনের এসএমএস অ্যাপ খুলে দেয়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এসএমএস পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর ও বার্তা আগে থেকেই সেট করা থাকে। ফলে ব্যবহারকারী বুঝে ওঠার আগেই আন্তর্জাতিক নম্বরে মেসেজ চলে যায়।
কীভাবে কাজ করে এই প্রতারণা?
সাইবার অপরাধীরা সাধারণত ভুয়া বিজ্ঞাপন, নকল ওয়েবসাইট অথবা পরিচিত টেলিকম প্রতিষ্ঠানের নামের কাছাকাছি ডোমেইন ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অনেক সময় ওয়েবসাইটের ঠিকানায় খুব সামান্য বানান পরিবর্তন থাকে, যা সহজে চোখে পড়ে না।
একবার ব্যবহারকারী সেখানে প্রবেশ করলে তাকে “ভেরিফিকেশন” বা “সিকিউরিটি চেক” সম্পন্ন করার কথা বলা হয়। এরপর একটি বাটনে ক্লিক করতে বলা হয়, যা সরাসরি মোবাইলের মেসেজ অ্যাপ খুলে দেয়।
এই আক্রমণের কৌশল আরও জটিল কারণ এটি একটিমাত্র নম্বরে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং একাধিক ধাপে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক নম্বরে এসএমএস পাঠানো হয়। এসব দেশের মধ্যে আজারবাইজান, মিয়ানমার, মিশরসহ এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে এসএমএস চার্জ তুলনামূলক বেশি।
কেন এই প্রতারণা লাভজনক?
এই কৌশলকে বলা হয় “ইন্টারন্যাশনাল রেভিনিউ শেয়ার ফ্রড”। সহজভাবে বলতে গেলে, নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নম্বরে বেশি পরিমাণ এসএমএস পাঠিয়ে সেখান থেকে অর্থ উপার্জন করা হয়। ওই আয়ের একটি অংশ অপরাধীদের কাছে ফিরে যায়।
ফলে ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার মোবাইল ব্যালেন্স বা বিল থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ ডলার বা তারও বেশি অর্থ কেটে যেতে পারে।
কেন বিষয়টি ভয়ংকর?
এই প্রতারণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এখানে প্রচলিত অর্থে “হ্যাকিং” হয় না। ফোনে ভাইরাস ঢোকে না, অ্যাকাউন্টও হ্যাক হয় না। তাই অনেক অ্যান্টিভাইরাস বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এটিকে শনাক্ত করতে পারে না।
ব্যবহারকারী নিজেই অজান্তে এসএমএস পাঠানোর অনুমতি দিয়ে ফেলেন। আর সেই সুযোগেই পুরো প্রতারণা সম্পন্ন হয়।
যেভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
নিজেকে মানুষ প্রমাণ করতে কখনও এসএমএস পাঠাবেন না
আসল ক্যাপচা কখনও মেসেজ অ্যাপ খুলতে বলে না
অচেনা বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইটে ক্লিক করা এড়িয়ে চলুন
ওয়েবসাইটের ডোমেইন ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই করুন
হঠাৎ করে এসএমএস অ্যাপ খুলে গেলে সতর্ক হোন
মোবাইল বিল বা ব্যালেন্স নিয়মিত পরীক্ষা করুন
অপ্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক এসএমএস সুবিধা বন্ধ রাখতে পারেন
অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা
বাস্তবে মানুষ ব্যস্ততা বা তাড়াহুড়োর কারণে অনেক সময় না ভেবেই “ভেরিফাই”, “কন্টিনিউ” বা “আই অ্যাম নট এ রোবট” বাটনে ক্লিক করে ফেলেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রতারণার ফাঁদ।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত সূক্ষ্ম হচ্ছে। তাই শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা নয়, ব্যবহারকারীর সচেতনতাও এখন সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment