বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Friday, May 15, 2026

রমনা কালী মন্দির: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতির এক অমর প্রতীক

রমনা কালী মন্দির

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রমনা কালী মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের বেদনাময় স্মৃতির এক জীবন্ত সাক্ষী। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো এই মন্দির যুগের পর যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী আগে বদ্রী নারায়ণের যোশী মঠের সন্ন্যাসী গোপাল গিরি ঢাকায় এসে রমনা এলাকায় একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিকভাবে এটি ‘কাঠঘর’ নামে পরিচিত ছিল। পরে সাধক হরিচরণ গিরি সেখানে মা কালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে এটি ‘রমনা কালীবাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটির খ্যাতি ও গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিশ শতকের শুরুতে ভাওয়ালের রানী বিলাশমনি দেবীর পৃষ্ঠপোষকতায় মন্দিরটির ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়। তাঁর উদ্যোগে মন্দিরের স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। উঁচু চূড়া, নান্দনিক নকশা এবং বিশাল পরিসরের কারণে এটি তৎকালীন ঢাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত, সাধু ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখর থাকত পুরো রমনা এলাকা।
কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এই মন্দিরের ইতিহাসে নিয়ে আসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্বাধীনতার সূচনালগ্নেই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মতো রমনাকেও টার্গেট করে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর রমনা কালী মন্দির ও আশ্রমে আশ্রয় নেন বহু নিরীহ মানুষ। কিন্তু ২৭ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অংশ হিসেবে মন্দিরে ভয়াবহ হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী পরমানন্দ গিরিসহ নারী, পুরুষ ও শিশুকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে রমনা কালী মন্দির পরিণত হয় হত্যাযজ্ঞের এক ভয়ঙ্কর স্থানে। বিভিন্ন সূত্র মতে, ওই হামলায় প্রায় একশ মানুষ নিহত হন।
শুধু হত্যাকাণ্ডেই থেমে থাকেনি পাকিস্তানি বাহিনী। হত্যাযজ্ঞের পর তারা ডিনামাইট দিয়ে পুরো মন্দির ও আশ্রম ধ্বংস করে দেয়। শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উপাসনালয় মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে সেই ধ্বংসাবশেষ মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সহযোগিতায় রমনা কালী মন্দির পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভারত সরকারের অর্থায়নে নতুন নকশায় মন্দিরটি পুনর্গঠিত হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি Ram Nath Kovind পুনর্নির্মিত রমনা কালী মন্দির উদ্বোধন করেন।
বর্তমানে ৯৬ ফুট উচ্চতার চূড়াবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই মন্দির আবারও ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী এখানে আসেন পূজা, প্রার্থনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুভব করতে।
রমনা কালী মন্দির আজ শুধু একটি উপাসনালয় নয়। এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের এক অমর প্রতীক। শত ধ্বংসের পরও যে ইতিহাস আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, রমনা কালী মন্দির তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

No comments:

Post a Comment

"
"