বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Friday, May 22, 2026

২১ মে’র ভয়াল ডাকরা গণহত্যা: কালী মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া শত শত মানুষের নির্মম হত্যাযজ্ঞ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২১ মে এক বিভীষিকাময় দিন। এই দিন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের ডাকরা গ্রামে সংঘটিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা। ডাকরা কালী মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া শত শত নিরস্ত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীর ওপর চালানো হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ, যা আজও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে আতঙ্ক হয়ে রয়েছে।
ডাকরা কালী মন্দির ছিল পুরো অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র। মন্দিরের প্রধান ধর্মগুরু বিনোদ বিহারী চক্রবর্তী, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘নোয়াকর্তা’ নামে পরিচিত ছিলেন, এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের নির্যাতন বাড়তে থাকলে এ অঞ্চলের বহু হিন্দু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ডাকরা কালী মন্দির এলাকায় এসে জড়ো হয়। স্থানীয় কিছু রাজাকার ও শান্তি কমিটির নেতারা তাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে কোনো ক্ষতি করা হবে না। সেই বিশ্বাসে অনেকে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা স্থগিত করে মন্দির এলাকাতেই অবস্থান নেন।
পরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠলে সিদ্ধান্ত হয় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার। ১৯ ও ২০ মে’র মধ্যে ডাকরা ও আশপাশের এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
কিন্তু সেই খবর পৌঁছে যায় রাজাকার বাহিনীর কাছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করা হয়।
১৯৭১ সালের ২১ মে দুপুরে, যখন মানুষ নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন রাজাকারদের দুটি নৌকা ডাকরার পাশের খালে এসে ভিড়ে। নৌকা থেকে নেমেই তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। আতঙ্কে নারী, পুরুষ ও শিশুরা দিকবিদিক ছুটতে থাকে।
অনেকে প্রাণ বাঁচাতে কালী মন্দির ও ঠাকুরবাড়ির সামনে আশ্রয় নিলেও সেখানেও রক্ষা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজাকাররা নারী ও পুরুষদের আলাদা করে ফেলে এবং পরে একে একে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
স্থানীয়দের মতে, ডাকরা গণহত্যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণাঞ্চলে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন নিহতদের স্বজন ও বেঁচে ফেরা মানুষরা।

 

No comments:

Post a Comment

"
"