মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার। প্রতিদিন শরীরের বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে ফেলা, খাবার হজমে সহায়তা করা, শক্তি সঞ্চয় এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি তৈরি করার মতো শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই অঙ্গটি। কিন্তু সমস্যা হলো, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করলেও শুরুতে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই দেরিতে বুঝতে পারেন যে শরীরে গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরের কিছু সাধারণ পরিবর্তনও হতে পারে লিভারের জটিল রোগের প্রাথমিক সতর্কবার্তা। তাই এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যেসব কারণে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
লিভারের বিভিন্ন ধরনের রোগ রয়েছে। এর মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস অন্যতম। হেপাটাইটিস এ, বি ও সি ভাইরাস লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
এছাড়া সিরোসিস নামের রোগে লিভারে স্থায়ী দাগ তৈরি হয়। একসময় সুস্থ টিস্যুর জায়গা দাগে ভরে গেলে লিভার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না।
বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের সমস্যাও দ্রুত বাড়ছে। অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়া এর বড় কারণ। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণেও অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে লিভারে ক্যানসারও দেখা দিতে পারে। আবার শরীরের অন্য অংশের ক্যানসার থেকেও লিভারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
লিভার খারাপ হলে শরীর যেসব সংকেত দেয়
চিকিৎসকদের মতে, নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন—
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিসের লক্ষণ)
পেটব্যথা বা পেট ফুলে যাওয়া
শরীরে সহজে কালশিটে পড়ে যাওয়া
ত্বকে অস্বাভাবিক চুলকানি
পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া
চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
ক্ষুধামন্দা
বমি বমি ভাব বা বমি
সবসময় দুর্বল বা ক্লান্ত লাগা
সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের পায়খানা
রক্তচাপ কমে যাওয়া
বিভ্রান্তি বা ভারসাম্য হারানো
হাত কাঁপা বা শরীরে কম্পন হওয়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণ অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা থাকলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়।
কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
লিভারের সমস্যা শনাক্ত করতে চিকিৎসকরা সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করে থাকেন। প্রয়োজনে আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই কিংবা বায়োপসির মতো পরীক্ষাও করতে হতে পারে।
লিভার সুস্থ রাখতে যা করবেন
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু সাধারণ অভ্যাস লিভারকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—
অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন
ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে থাকুন
নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখুন
অন্যের রেজর বা ব্যক্তিগত জিনিস ব্যবহার করবেন না
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ওষুধ খাবেন না
স্বাস্থ্যকর খাবার খান
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
লিভার এমন একটি অঙ্গ, যা দীর্ঘ সময় নীরবে কাজ করে যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর অনেক সময় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সময়মতো সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই পারে বড় ধরনের ঝুঁকি কমাতে।

No comments:
Post a Comment