বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Thursday, May 28, 2026

১১৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী ডিমলা কালী মন্দির, উত্তরবঙ্গের সনাতনী চেতনার জীবন্ত প্রতীক

রংপুরের মাহিগঞ্জে আজও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সনাতন ধর্মীয় চেতনার এক অনন্য স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ডিমলা কালী মন্দির। শতাব্দী পেরিয়েও এই মন্দির শুধু উপাসনালয় নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের সনাতন সমাজের আত্মিক অনুভূতি, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে।
প্রায় ১১৬ বছরের পুরনো এই মন্দিরে ঢুকলেই মন গভীর আধ্যাত্মিকতায় ডুবে যায়। প্রাচীন দেয়ালে খচিত কারুকাজ, উঁচু গম্বুজ আর রাজকীয় স্থাপত্য যেন আজও অতীতের ঐশ্বর্যময় দিনগুলোর গল্প বলে। ভোরের শঙ্খধ্বনি, সন্ধ্যার আরতি, ধূপ-ধুনোর সুগন্ধ আর ভক্তদের কণ্ঠে স্তবপাঠ— সব মিলিয়ে মন্দির চত্বরে তৈরি হয় এক পবিত্র আবহ। ভক্তদের বিশ্বাস, মা কালীর আশীর্বাদ ও করুণাধারা আজও এই মন্দিরকে সজীব রেখেছে।
ইতিহাস বলছে, ডিমলার তৎকালীন জমিদার নীল কমল সেনের বিধবা স্ত্রী শ্যামা সুন্দরীর দত্তক পুত্র রাজা জানকি বল্লভ সেন গভীর ধর্মীয় ভক্তি থেকেই ১৯০৮ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন এটি হবে ভক্তি, শিল্পরুচি ও রাজকীয় স্থাপত্যকলার এক মিলনমেলা। কিন্তু কাজ চলাকালেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী বৃন্দারাণী চৌধুরানী অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে।
শিল্পী, কারিগর আর শ্রমিকদের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম শেষে ১৯১৬ সালে সম্পন্ন হয় এই ঐতিহাসিক মন্দিরের নির্মাণ। মন্দিরের অষ্টকৌণিক গঠনশৈলী উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য মন্দির থেকে একে আলাদা করে রেখেছে। দেয়ালের সূক্ষ্ম নকশা, অলংকরণ আর স্থাপত্যের প্রতিটি রেখায় যেন সনাতন ঐতিহ্যের সৌন্দর্য আর ভক্তির ছোঁয়া মিশে আছে।
শুধু কালীমাতার বিগ্রহই নয়, রাজা জানকি বল্লভ সেন লক্ষ্মী নারায়ণ জিউ, মদন মোহন জিউ এবং রামচন্দ্র বিগ্রহের নামেও বিপুল সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে দান করেন। পরে সেসব সম্পত্তি "ডিমলা রাজ দেবোত্তর এস্টেট" নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। বর্তমানে পরিচালনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা, আরতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলে আসছে।
প্রতি বছর কালীপূজাকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের ঢল নামে। দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন মায়ের আশীর্বাদ নিতে। সন্ধ্যার আরতির সময় শত শত প্রদীপের আলো, ঘণ্টাধ্বনি আর ভক্তিমূলক কীর্তনে গোটা এলাকা যেন অপার্থিব হয়ে ওঠে। বহু ভক্ত মনে করেন, আন্তরিকভাবে মায়ের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি মনোবাসনা পূর্ণ করেন।
রংপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পূর্বে এবং মাহিগঞ্জ বাজারের এক কিলোমিটার দক্ষিণে বড় রঙ্গপুর এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির আজও সনাতন ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। কালের নিয়মে অনেক কিছু বদলালেও ডিমলা কালী মন্দির ভক্তদের হৃদয়ে আজও একইভাবে শ্রদ্ধা, ভক্তি আর আস্থার স্থান দখল করে আছে।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলছেন, এই শতবর্ষী মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি উত্তরবঙ্গের হিন্দু সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও সামাজিকভাবে আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

No comments:

Post a Comment

"
"