‘সাগরকন্যা’ খ্যাত পটুয়াখালীর কুয়াকাটা প্রতিদিনই টানে হাজারো পর্যটককে। সমুদ্রের গর্জন, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই সৈকত নগরীতে। তবে কুয়াকাটার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে, যা আজ অবহেলা আর অযত্নে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেটি হলো বহু পুরোনো ঐতিহাসিক ‘কুয়াকাটার কুয়া’।
স্থানীয়দের মতে, ১৭৮৪ সালে রাখাইন সম্প্রদায়ের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে এই কূপ খনন করা হয়েছিল। সেই সময় উপকূলীয় এই অঞ্চলে মিঠা পানির সংকট ছিল তীব্র। তখন এই কুয়ার পানিই ছিল স্থানীয় মানুষের ভরসা। ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা, এই ‘কুয়া’ থেকেই পরবর্তীতে এলাকার নাম হয় ‘কুয়াকাটা’।
বর্তমানে কুয়াটি একটি বৌদ্ধ বিহারের পাশে সংরক্ষিত থাকলেও এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। সেখানে কোনো সাইনবোর্ড বা পরিচিতিমূলক তথ্যফলক না থাকায় অনেক পর্যটকই বুঝতে পারেন না যে এটি কুয়াকাটার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়ার চারপাশে অবহেলার চিত্র স্পষ্ট। প্রবেশপথে তারকাঁটার বেড়া থাকলেও নেই কোনো সৌন্দর্যবর্ধন বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পলিথিন, পানির বোতল ও বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা। কুয়ার ভেতরের পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ায় সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা এক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কুয়াকাটার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার এমন অবস্থা সত্যিই হতাশাজনক। এটি সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, “এই কুয়াটি শুধু একটি কূপ নয়, এটি কুয়াকাটার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। অথচ বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে আছে। দ্রুত সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে হয়তো এই নিদর্শন হারিয়ে যাবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে কুয়াকাটার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হলেও ঐতিহাসিক এই কুয়ার সংরক্ষণে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে এর সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কলাপাড়া পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদেক জানিয়েছেন, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। খুব দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন মহলের দাবি, শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই নয়, এই কুয়ার পাশে তথ্যসমৃদ্ধ ফলক স্থাপন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, কুয়াকাটার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কুয়া কেবল একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি উপকূলীয় জনপদের অতীত জীবনধারা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment