বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Thursday, May 7, 2026

চকরিয়ায় ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ নাকি পরিকল্পিত হত্যা? পিবিআই তদন্তে বেরিয়ে এলো ভয়াবহ সত্য

চকরিয়া-র ব্যস্ত মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা প্রথমে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঘটনার তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ এক সত্য। যেটিকে শুরুতে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরা হয়েছিল, পরে তা রূপ নেয় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে।
ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে। মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের কর্তা সুরেশ চন্দ্র সুশীলের মৃত্যুর দশম দিনের পূজা শেষে তারা রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সময় একটি সবজিবোঝাই পিকআপ বেপরোয়া গতিতে এসে তাদের চাপা দেয়।
এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান অনুপম সুশীল, নিরুপম সুশীল, দীপক সুশীল ও চম্পক সুশীল। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান স্মরণ সুশীল এবং ১৪ দিন পর মৃত্যুবরণ করেন রক্তিম সুশীল। আহত হন আরও দুই ভাই প্লাবন সুশীল ও বোন হীরা সুশীল।
প্রথমদিকে বিষয়টি নিছক সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। থানায় মামলা হয় অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে। তদন্তের প্রাথমিক ধাপে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি একটি “রোড ট্রাফিক ইনজুরি”। এমনকি নিহতদের অধিকাংশ মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। একটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় এলে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-কে। এরপরই শুরু হয় মামলার মোড় ঘুরে যাওয়ার গল্প।
পিবিআই তদন্তে জানতে পারে, দুর্ঘটনার পর পিকআপটি থেমে গেলেও চালক আহতদের উদ্ধার করার পরিবর্তে আবার গাড়ি চালু করে পেছনে নিয়ে একই ব্যক্তিদের ওপর পুনরায় চাপা দেন। এরপর সামনে এগিয়ে আরও কয়েকজনকে আঘাত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
তদন্তকারীরা মনে করেন, এই আচরণ কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দুর্ঘটনার পর চালকের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডই মামলাটিকে হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চালক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে পিকআপের মালিককেও গ্রেফতার করা হয়।
পিবিআই আরও জানতে পারে, দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত পিকআপটির ফিটনেস, রুট পারমিট ও চালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলের অবস্থা, গাড়ির গতিপথ এবং আহতদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন যে প্রথম ধাক্কার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় গাড়ি চালিয়ে মানুষ চাপা দেওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পিবিআইয়ের বই ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’-এ। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সঠিক তদন্ত, আচরণগত বিশ্লেষণ এবং ঘটনাস্থলের তথ্যপ্রমাণ অনেক সময় একটি সাধারণ দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরাধকে উন্মোচন করতে পারে।
সবশেষে পিবিআই চালকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যা মামলা এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর আওতায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। অপর দুই আসামির বিচার এখনও চলমান রয়েছে।
এই মামলাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, অনেক সময় একটি ঘটনাকে প্রথম দেখায় দুর্ঘটনা মনে হলেও গভীর তদন্তে তার পেছনে ভয়ংকর অপরাধের চিত্র উঠে আসতে পারে।


No comments:

Post a Comment

"
"