খুরুশকুল-এ শিব-কালী মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি জমি বিক্রি ও দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ এপ্রিল পূর্ব হামজার ডেইল এলাকার একটি পাহাড়ি জঙ্গল থেকে গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় নয়ন সাধুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর তিন দিন আগে থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার বছর আগে পাহাড়ি জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে সেখানে “শ্রী শ্রী শিব কালী মন্দির” প্রতিষ্ঠা করা হয়। কথিত জমির মালিক আবুল হোছনের উদ্যোগে চন্দনাইশ থেকে সুকুমার ব্রহ্মচারী নামে এক সাধুকে এনে মন্দির গড়ে তোলা হয়। পরে মন্দিরকে কেন্দ্র করে আশপাশের জমি বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের কাছে বিক্রি শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জমি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে আবুল হোছনের সঙ্গে তার ভাতিজাদের বিরোধ শুরু হয়। স্থানীয়দের দাবি, ভাতিজারা জমি ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতেন। টাকা না দিলে ঘরবাড়িতে হামলা, টিন ও আসবাবপত্র খুলে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে চাচা-ভাতিজাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি একটি জমি দখল বুঝিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তখন থেকেই এলাকায় বসবাসরত হিন্দু পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখানো ও এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
মন্দিরের ভেতরেও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা গেছে। প্রথমে সুকুমার ব্রহ্মচারী মন্দির পরিচালনা করলেও পরে সেখানে সঞ্জয় সাধুকে সেবায়েত হিসেবে আনা হয়। এরপর নয়ন সাধুর জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা হলে দুই সেবায়েতের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পূজা-পার্বণ ও মন্দির পরিচালনা নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধের ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয়দের ধারণা, এই সেবায়েত দ্বন্দ্বকে সামনে এনে মূল জমি বিরোধকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের দাবি, জমি দখল ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই নয়ন সাধুকে হত্যা করা হতে পারে।
ঘটনার রাতে এক প্রত্যক্ষদর্শী পাহাড়ি পথে মুখোশধারী কয়েকজন অস্ত্রধারীর মুখোমুখি হওয়ার দাবি করেছেন। তিনি জানান, তাকে মারধর করে ঘটনাটি গোপন রাখতে হুমকি দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তির দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে একজনকে তিনি আবুল হোছনের ভাতিজা হিসেবে চিনতে পেরেছেন।
এদিকে, নয়ন সাধু নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দ্রুত আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ-এর কক্সবাজার জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিটু ঘটনাটিকে “সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনার মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবুল হোছন। তার দাবি, ভাতিজাদের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই এবং ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
এ বিষয়ে এ. এম. এ সাজেদুর রহমান, কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার, বলেন, “এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। তদন্ত চলমান রয়েছে।”
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment