সনাতন ধর্মের বিশ্বব্যাপী প্রসারের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন ও গৌরবময় অধ্যায়। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে প্রথমবারের মতো বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভগবান গণেশের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ল্যাটিন আমেরিকায় সনাতন ধর্মের বিকাশ ও ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বিস্তারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো অঙ্গরাজ্যের মনোরম পাহাড়ি শহর পেত্রোপোলিসে অবস্থিত ‘সেন্ট্রো কালচারাল বিশ্ব বিদ্যা’ কেন্দ্রে গত ৯ মে অনুষ্ঠিত হয় এই মহতী প্রাণ প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠান। বৈদিক রীতিনীতি অনুসারে হোম, যজ্ঞ, পূজা-অর্চনা এবং সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে ভগবান গণেশের পবিত্র বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভক্তবৃন্দ ও অতিথিরা এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশের সাক্ষী হন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাজিলে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ভাটিয়া। এছাড়াও অংশ নেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত আধ্যাত্মিক শিক্ষক ও বেদান্তাচার্য জোনাস মাঁসেটি (বিশ্বনাথ), যিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলে বেদান্ত, সংস্কৃত, যোগ ও ভারতীয় দর্শনের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
ভারত থেকে বিশেষভাবে আনা কালো পাথরের এই গণেশ মূর্তির উচ্চতা প্রায় ১.২০ মিটার এবং ওজন প্রায় ৫০০ কিলোগ্রাম। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাণ প্রতিষ্ঠার সময় অগ্নিহোম, বৈদিক স্তোত্রপাঠ এবং মন্ত্রোচ্চারণে পুরো প্রাঙ্গণ ভক্তিময় আবহে মুখর হয়ে ওঠে।
সনাতন ধর্মে ভগবান গণেশকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মঙ্গল ও শুভ সূচনার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। যে কোনো শুভ কাজের শুরুতে তাঁর আরাধনার প্রচলন রয়েছে। তাই ব্রাজিলে এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা ও বৈদিক সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ল্যাটিন আমেরিকায় সনাতন ধর্ম ও ভারতীয় দর্শনের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যোগ, ধ্যান, বেদান্ত ও আত্মজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠা সেই ধারাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত বেদান্ত ও আত্মজ্ঞান উৎসবে ব্রাজিলের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সেখানে যোগচর্চা, ধ্যান, শাস্ত্র আলোচনা, মন্ত্রপাঠ এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রদূত দীনেশ ভাটিয়া তাঁর বক্তব্যে ব্রাজিলে ভারতীয় সংস্কৃতি ও সনাতন দর্শনের প্রসারে বিশ্ব বিদ্যা কেন্দ্রের অবদানের প্রশংসা করেন।
ইতোমধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই ঐতিহাসিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং একে সনাতন ধর্মের বিশ্বজয়ের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিদেশের মাটিতে বৈদিক মন্ত্রধ্বনি, হোম-যজ্ঞ এবং ভগবান গণেশের আরাধনার মধ্য দিয়ে ব্রাজিলে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, তা নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী সনাতন ধর্মের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের এক অনন্য সাক্ষ্য হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment