বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Sunday, May 17, 2026

করতোয়ার পাড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে ১৮০ বছরের ইতিহাস, পঞ্চগড়ের গোলকধাম মন্দির আজও বিস্ময়

পঞ্চগড়ের গোলকধাম মন্দির

বাংলাদেশের একেবারে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। সবুজ প্রকৃতি আর নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের বুকেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো এক ঐতিহাসিক স্থাপনা— গোলকধাম মন্দির। সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের জনপদও। কিন্তু করতোয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন মন্দির যেন এখনো অতীত বাংলার গল্প শুনিয়ে যায়।
দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের শালডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই মন্দির শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি উত্তর বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবেও পরিচিত।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে স্থানীয় জমিদার গোলককৃষ্ণ গোস্বামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। তাঁর নাম থেকেই আসে “গোলকধাম” নামটি। মন্দিরের দেয়ালে থাকা শিলালিপি আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উৎসর্গ করে নির্মিত এই মন্দির বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর–এর সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত।
তবে গোলকধাম মন্দিরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্থাপত্যশৈলী। প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ে এর ব্যতিক্রমী নকশা। প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্যের করিন্থিয়ান কলাম আর মুঘল আমলের খিলানশৈলীর মিশেলে তৈরি এই মন্দির যেন এক অন্যরকম শিল্পকর্ম।
অষ্টভুজাকার কাঠামোর ওপর নির্মিত একতলা এই মন্দিরের উপরে রয়েছে পাঁচটি চূড়া। এ কারণেই অনেকেই একে “পঞ্চরত্ন মন্দির” বলেও চেনেন। প্রবেশপথের পিলারজুড়ে খোদাই করা লতাপাতা আর মুখাবয়বের নকশা আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
মন্দিরের সামনে রয়েছে পুরোনো তুলসী মঞ্চ। পাশেই একটি ঐতিহাসিক কুয়া, যেখান থেকে একসময় মন্দিরের জন্য পানি সংগ্রহ করা হতো। চারপাশের নীরব পরিবেশ আর করতোয়ার বাতাস পুরো জায়গাটিকে অন্যরকম এক আবহ এনে দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এই মন্দিরকে ঘিরেই ছিল প্রাণবন্ত সনাতনী জনপদ। পূজা, আরতি আর ধর্মীয় উৎসবে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জনপদ প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন আশপাশে তেমন কোনো হিন্দু বসতি নেই বললেই চলে।
তবু ইতিহাসের টানে প্রতিদিনই এখানে আসেন দর্শনার্থীরা। কেউ আসেন স্থাপত্য দেখতে, কেউ ইতিহাস জানতে, আবার কেউ নিভৃতে কিছু সময় কাটাতে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সঠিক সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে গোলকধাম মন্দির উত্তর বাংলার অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি মন্দির নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যবান অংশ।
শত বছরের বেশি সময় ধরে করতোয়ার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা গোলকধাম মন্দির আজও যেন নীরবে বলে যায় বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক গৌরবময় ইতিহাসের কথা।

 

No comments:

Post a Comment

"
"