ইসকন নেতা ও বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী–এর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় আদালতের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তাঁর আইনজীবী জয়া ভট্টাচার্য। তবে একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আদালতের আদেশের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই তারা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে শুনানি শেষে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে গিয়ে জয়া ভট্টাচার্য বলেন, আদালত যে আদেশ দিয়েছেন, সেটি তারা মাথা পেতে নিয়েছেন। আদালতের প্রতি সম্মান রেখেই তারা নিজেদের আইনগত অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে জামিন না দেওয়ার যে কারণ দেখানো হয়েছে, সেটি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, আদালত মূলত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন। কিন্তু তাদের মতে, শুধু “সাক্ষ্য শুরু হয়েছে” এই যুক্তি জামিন প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট নয়।
জয়া ভট্টাচার্য বলেন, “আমি কোর্টের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, কোর্ট যে অর্ডার দিয়েছে আমরা সেটা মাথা পেতে নিয়েছি। কোর্ট বলেছে, তারা মামলার মেরিটে যায়নি, শুধু সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে বলে এই পর্যায়ে জামিন দেয়নি। আমাদের মূল আপত্তি ছিল এই জায়গাতেই।”
তিনি দাবি করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার অধীনে জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়াকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ধরা ঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, “সাক্ষী শুরু হওয়া কোনো গ্রাউন্ড না ৪৯৮-এর। এটা ৫২৬ ধারার প্রসঙ্গ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে হাইকোর্টে একটা ট্র্যাডিশন দাঁড়িয়েছে যে সাক্ষ্য শুরু হয়ে গেলে অনেকে আবেদন করেন না। কিন্তু বাস্তবে অনেক মামলায় সাক্ষ্য শুরু হওয়ার পরও জামিন দেওয়া হয়েছে।”
আইনজীবী জয়া ভট্টাচার্য আরও বলেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পুরোপুরি শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এখনো মামলার বিচার প্রক্রিয়া প্রাথমিক ধাপেই রয়েছে। ফলে এই অবস্থায় জামিন দেওয়া আইনগতভাবে অসম্ভব ছিল না বলেই তারা মনে করেন।
তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরে বলেন, যে সময় আলোচিত ঘটনাটি ঘটে, সেই সময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কারাগারে ছিলেন। তাই একজন ব্যক্তি কারাবন্দী অবস্থায় কীভাবে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে জয়া ভট্টাচার্য বলেন, “আলিফ হত্যা মামলার সময় চিন্ময় প্রভু জেলে ছিলেন। একজন লোক জেলে থাকা অবস্থায় কীভাবে এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন? এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, দেশে বিভিন্ন গুরুতর মামলার আসামিরাও অনেক সময় জামিন পেয়ে থাকেন। সেই তুলনায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনায় তার জামিন না পাওয়াকে তারা হতাশাজনক হিসেবে দেখছেন।
“আমরা তো দেখি অনেক রাঘববোয়ালের জামিন হয়ে যায়। চিন্ময় প্রভু এমন কোনো অপরাধ করেননি যে জামিন না পাওয়ার মতো,” বলেন তিনি।
তবে আদালতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও বিচার বিভাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি বারবার উল্লেখ করেন জয়া ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “আমরা আদালতের আদেশ মেনে নিয়েছি। এখন পরবর্তীতে কী করা যায়, সেটা আইনি টিম আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।”
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ নভেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী–কে চট্টগ্রামে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এরপর আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অনুসারীরা বিক্ষোভ শুরু করেন এবং তাকে কারাগারে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন।
পরে নিহত আইনজীবীর বাবা হত্যা মামলা দায়ের করেন। একইসঙ্গে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে আরও কয়েকটি মামলা হয়। এসব মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে দেশের সনাতনী সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর অনুসারীরা দাবি করছেন, তিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আইন অনুযায়ীই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে হাইকোর্টে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সনাতনী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতারা এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলাগুলো এখন শুধু আইনি নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতে এ বিষয়ে আরও আইনি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কারাগারেই রয়েছেন। তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং প্রয়োজন হলে উচ্চতর আদালতে নতুন আবেদন করা হতে পারে।
.png)
No comments:
Post a Comment