ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের ওয়ারাঙ্গাল জেলায় প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এক কাকাতীয় যুগের শিব মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি একটি ইন্টিগ্রেটেড স্কুল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য বুলডোজার দিয়ে ঐতিহাসিক এই মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে।
ঘটনার পর ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ইতিহাসবিদ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।
জানা গেছে, ওয়ারাঙ্গাল জেলার খানাপুর মণ্ডলের অশোক নগর এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন শিব মন্দিরটি ১৩শ শতাব্দীতে কাকাতীয় রাজা গণপতিদেব–এর আমলে নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, কাকাতীয় সাম্রাজ্য দক্ষিণ ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজবংশ ছিল। তাদের শাসনামলে বহু মন্দির, দুর্গ ও শিল্পনির্ভর স্থাপনা নির্মিত হয়। ধ্বংস হওয়া এই মন্দিরটিও সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল।
মন্দির প্রাঙ্গণে ১২৩১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে উৎকীর্ণ সাত লাইনের একটি বিরল তেলেগু শিলালিপিও ছিল। ওই শিলালিপিতে রাজা গণপতিদেবকে “মহারাজা” ও “রাজাধিরাজুলু” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। গবেষকদের মতে, এটি শুধু ধর্মীয় নয়, ভাষাগত ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও অত্যন্ত মূল্যবান দলিল ছিল।
ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, ১৯৬৫ সালেই হেরিটেজ বিভাগ এই স্থাপনাটিকে নথিভুক্ত করেছিল। মন্দিরটি ঐতিহাসিক “কোটা কাট্টা” মাটির দুর্গ এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নসম্পদ ও প্রাচীন স্থাপনার জন্য পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় চাইলে মন্দিরটিকে সংরক্ষণ অথবা প্রযুক্তিগতভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই পথ না বেছে সরাসরি স্থাপনাটি ভেঙে ফেলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ওয়ারাঙ্গাল জেলা প্রশাসন দাবি করেছে, এটি পরিকল্পিতভাবে মন্দির ধ্বংসের ঘটনা নয়। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ একর জায়গা পরিষ্কার করার সময় ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটি জরাজীর্ণ পুরোনো স্থাপনার অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। তাদের দাবি, এটি সরকারিভাবে সংরক্ষিত প্রত্নস্থাপনার তালিকায় ছিল না।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়ারাঙ্গালের কালেক্টর ডা. সত্যা শারদা এবং নরসাম্পেটের বিধায়ক দোস্থি মাধব রেড্ডি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা জানিয়েছেন, ইতিহাসবিদ, ঐতিহ্যবাহী স্থপতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পরামর্শে একই স্থানে পুনরায় মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই ভারতের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment