বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Saturday, May 9, 2026

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষীরগ্রামের প্রাচীন শক্তিপীঠের রহস্য ও ঐতিহ্য

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষীরগ্রাম বহু শতাব্দী ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। পূর্ব বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট ব্লকে অবস্থিত এই গ্রাম মূলত বিখ্যাত মা যোগাদ্যা মন্দির–এর জন্য। শাক্তধর্ম অনুসারীদের বিশ্বাস, এটি হিন্দু ধর্মের ৫১টি সতীপীঠের অন্যতম। তাই সারা বছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত, সাধক ও দর্শনার্থী এখানে এসে দেবীর পূজা ও দর্শন করেন।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, রাজা দক্ষের যজ্ঞসভায় অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী আত্মাহুতি দেন। এরপর শোকে মুহ্যমান মহাদেব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলে গোটা সৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ক্ষীরগ্রামের এই স্থানে সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল পতিত হয়েছিল। সেই থেকেই এটি সতীপীঠ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে। এখানে দেবী ‘যুগাদ্যা’ বা ‘যোগাদ্যা’ নামে পূজিতা হন এবং তাঁর ভৈরব হিসেবে পূজিত হন ‘ক্ষীরকণ্ঠ’ শিব।
মা যোগাদ্যাকে এখানে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে পূজা করা হয়। মন্দিরে থাকা দেবীমূর্তিটি কালো কষ্টিপাথরের তৈরি। ভাস্কর্যের গঠন ও অলংকরণে পাল-সেন যুগের শিল্পরীতির প্রভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, রামায়ণের মহীরাবণ বধের পর ভগবান হনুমান পাতাল থেকে এই দেবীমূর্তি উদ্ধার করে ক্ষীরগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই কারণেই অনেক ভক্ত দেবীকে ‘পাতাল ভৈরবী’ নামেও ডাকেন।
এই মন্দিরের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো, দেবী সারা বছর মন্দির সংলগ্ন ক্ষীরদীঘির জলের নিচে নিমজ্জিত অবস্থায় থাকেন। বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি তিথিতে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবীকে জল থেকে তুলে পূজা করা হয়। বিশেষ করে ৩১শে বৈশাখ ও ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ভক্তদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ সময় হাজার হাজার মানুষের সমাগমে পুরো ক্ষীরগ্রাম উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দূরদূরান্ত থেকে আগত ভক্তরা তখন দেবীর পূর্ণ দর্শন লাভ করেন।
অন্যান্য বিশেষ তিথিতে তান্ত্রিক বিধি অনুসারে গোপনীয় পরিবেশে দেবীর পূজা সম্পন্ন হয়। এই শক্তিপীঠে এখনো বহু প্রাচীন শাক্তাচার প্রচলিত রয়েছে। দেবীর নিত্যপূজায় আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয় এবং কিছু বিশেষ উৎসবে পশুবলির রীতিও পালন করা হয়। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, বহু আগে এখানে নরবলির প্রথাও ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে।
মা যোগাদ্যাকে ঘিরে ক্ষীরগ্রামে নানা লোকবিশ্বাস ও সামাজিক ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। জনশ্রুতি রয়েছে, একসময় দেবী শাঁখারি বেশে উমাকে শাঁখা পরিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিকে ঘিরে বৈশাখী উৎসবে দেবীকে বিশেষভাবে শাঁখা পরানো হয়। একই সঙ্গে গ্রামের বিবাহিত নারীরাও নতুন শাঁখা পরেন। ফলে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়েও মা যোগাদ্যার এই পীঠস্থান শুধু একটি মন্দির নয়, বরং বাংলার প্রাচীন শাক্তভক্তি, লোকবিশ্বাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরাণ, তন্ত্রসাধনা, লোককথা ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন আজও এই পবিত্র স্থানকে ভক্তদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র হিসেবে ধরে রেখেছে।

 

No comments:

Post a Comment

"
"