রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তি আর ইতিহাসের চেয়ে এখানকার দুর্গা বিগ্রহের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। প্রায় ৮০০ বছরের প্রাচীন এই অষ্টধাতুর দশভুজা দুর্গা মূর্তিকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে আছে একদিকে ধর্মীয় ভক্তি, অন্যদিকে দেশভাগ, লুটপাট ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস।
মন্দিরের স্থায়ী প্রতিমা বা বিগ্রহ হিসেবে পূজিত দেড় ফুট লম্বা দুর্গামূর্তিটি কখনো চুরি হয়েছে, কখনো তৈরি হয়েছে তার রেপ্লিকা বা প্রতিরূপ। বর্তমানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যে বিগ্রহটি রয়েছে, সেটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এটি কোনো আদি মূর্তি নয়, বরং একাধিক রেপ্লিকার সর্বশেষ সংস্করণ।
ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য কাজল দেবনাথ জানান, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর মন্দির কর্তৃপক্ষ শঙ্কিত হয়ে পড়েন যে এই মূল্যবান বিগ্রহটি হয়তো ধরে রাখতে পারবেন না। তখন ঢাকার তৎকালীন সেবায়েত প্রহ্লাদ মোহন তেওয়ারি ও হরিহর চক্রবর্তী নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী (সম্ভবত দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী)-র উদ্যোগে বিগ্রহটি কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে কুমারটুলীতে একটি ছোট্ট মন্দির করে 'শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দির' নামে তা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা আজও সেখানেই রয়েছে।
এরপর ১৯৪৮ সালে সেবায়েত হেমচন্দ্র চক্রবর্তীর উদ্যোগে ঢাকেশ্বরীর জন্য প্রথম অষ্টধাতুর রেপ্লিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সেই রেপ্লিকাটি লুট হয়ে যায়। ১৯৫১ সালে ভক্তরা আবারও অর্থ সংগ্রহ করে দ্বিতীয় রেপ্লিকা তৈরি করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিশৃঙ্খল রাতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একদল দুর্বৃত্ত সেবায়েতদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মন্দির থেকে ওই রেপ্লিকা বিগ্রহ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়।
তারপর ১৯৮৩ সালে বিখ্যাত 'মরণচাঁদ মিষ্টি'র প্রতিষ্ঠাতার ছেলে হরিপদ ঘোষ কলকাতা থেকে তৃতীয় আরেকটি অষ্টধাতুর রেপ্লিকা তৈরি করিয়ে আনেন। কিন্তু ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় 'ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস' সংক্রান্ত গুজব ছড়িয়ে বাংলাদেশে হিন্দুবিরোধী সহিংসতা শুরু হলে ঢাকেশ্বরী মন্দিরেও হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। তখন সেই প্রতিমা, সিংহাসন ও অলঙ্কারও লুট হয়।
পরে ১৯৯১ সালে ব্যাংকার দিলীপ দাশগুপ্তের অর্থায়নে ভাস্কর শংকর ধর পুরনো বিগ্রহের আদলে বর্তমান এই অষ্টধাতুর রেপ্লিকাটি তৈরি করেন, আর এর সিংহাসন বানিয়ে দেন চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী। এই বিগ্রহই এখন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজিত হয়ে আসছে।
হিন্দু পুরাণ মতে, রাজা বল্লাল সেনের স্বপ্নাদেশে দ্বাদশ শতাব্দীতে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেবী সতীর মুকুটের রত্ন যেখানে পড়েছিল, সেখানেই এর অবস্থান— তাই এটি একটি পীঠস্থান। ইতিহাসবিদদের মতে, ঢাকেশ্বরী দেবীর নাম থেকেই কালক্রমে 'ঢাকা' নামের উৎপত্তি হয়েছে।
কলকাতায় থাকা প্রাচীন সেই আদি বিগ্রহ ফেরত আনার কোনো উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়নি বলে জানান কাজল দেবনাথ। তিনি বলেন, "পীঠস্থানে মা চিরকাল আছেন। পূজা আমরা ঘটে, পটে, প্রতিমা বা বিগ্রহে করি। বিগ্রহটি একটি প্রতীক মাত্র। ঢাকার মা হিসেবে এখানেই মা দুর্গা বিরাজমান।"
তবে ঢাকার এই প্রাচীন বিগ্রহের গল্প এভাবেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, দেশভাগের বেদনা আর বারবার হারিয়ে ফেলা-ফিরে পাওয়ার এক জীবন্ত দলিল হয়ে আছে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment