দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের ছত্রশিকারপুর গ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী গোলকধাম মন্দির। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন মন্দিরটি দীর্ঘদিন ধরে ভক্ত, পর্যটক ও ইতিহাস-গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর স্থাপত্যরীতিতে অষ্টাদশ শতকের শিল্প ও নির্মাণশৈলীর স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দেবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে শান্ত ও মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই মন্দিরটি দূর থেকেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মন্দিরের প্রবেশপথে উভয় পাশে স্থাপিত শৈল্পিক হাতির প্রতিকৃতি এর ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। স্থানীয়ভাবে এই অংশকে ‘হাতি-পথ’ নামে অভিহিত করা হয়। প্রবেশমুখের এই অলংকরণ মন্দিরটির আভিজাত্য ও শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে গোলকধাম মন্দির বাংলাদেশের প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অষ্টভুজাকৃতির ভিত্তির ওপর নির্মিত মন্দিরটির মূল কাঠামো অত্যন্ত সুদৃশ্য ও ব্যতিক্রমধর্মী। এর উপরে রয়েছে তিনটি বৃহৎ গম্বুজ এবং চূড়াজুড়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র রত্নাকৃতির মিনার, যা দূর থেকে দেখলে এক অনন্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। মন্দিরের খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার, অলংকৃত দেয়াল এবং পোড়ামাটির কারুকাজ তৎকালীন শিল্পনৈপুণ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্দিরটির নির্মাণশৈলীতে মোঘল স্থাপত্যধারা ও স্থানীয় কারুশিল্পের এক চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়। দেয়ালের অলংকরণ, গম্বুজ নির্মাণের কৌশল এবং নকশার বৈচিত্র্য থেকে সেই সময়ের শিল্প-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ চিত্র ফুটে ওঠে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মন্দিরটি একসময় জরাজীর্ণ অবস্থায় পৌঁছে যায়। তবে এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় বর্তমানে এটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে মন্দিরটির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় দিক থেকেও গোলকধাম মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে এখানে বিপুল সংখ্যক ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। বিশেষ করে জন্মাষ্টমী, রাস উৎসব ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মন্দির প্রাঙ্গণ ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পর্যটকরাও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে ভিড় জমান।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও মন্দিরটি সহজে পৌঁছানো যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে পঞ্চগড় অথবা দেবীগঞ্জে এসে সেখান থেকে ইজিবাইক, অটোরিকশা বা স্থানীয় যানবাহনে করে শালডাঙ্গা ইউনিয়নের ছত্রশিকারপুর গ্রামে অবস্থিত গোলকধাম মন্দিরে পৌঁছানো সম্ভব।
ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নান্দনিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হিসেবে শ্রী শ্রী গোলকধাম মন্দির আজ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যবাহক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এই প্রাচীন স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment