শরতের শিউলিঝরা সকালে চারদিকে এখন শুধুই আনন্দের শিহরণ। কিন্তু এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে খুলনা শহর ছাড়িয়ে পুরো দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এক অনন্য দুর্গা প্রতিমা। ১২৯ তম বর্ষে পদার্পণ করা ঐতিহ্যবাহী 'সাহেবের কবরখানা সার্বজনীন পূজা কমিটি'র প্রতিমাটি দেখার জন্য এখন মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং কৌতূহল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি—সবখানেই এখন এই প্রতিমা নিয়ে জোর চর্চা চলছে। কেউ একে ভালোবেসে বলছেন ‘কিউট দুর্গা’, কেউবা শৈশবের আদলে দেখে আখ্যা দিচ্ছেন ‘কার্টুন দুর্গা’ বলে। তবে প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে কেন এমন রূপ দেওয়া হলো? উত্তর মিলল সাহেবের কবরখানা সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি বিষ্ণু ঘোষের কণ্ঠে।
কমিটির সভাপতি বিষ্ণু ঘোষ জানান, এবারের পূজায় তাঁদের মূল আগমনী ভাবনা—‘ঘরের মেয়ে উমা’। তিনি বলেন, “দেবী দুর্গা আমাদের কাছে কেবল ত্রিভুবনতারিণী, সর্বশক্তিমান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নন—তিনি তো আমাদের ঘরের সন্তান, আমাদের আদরের উমা। সারাটা বছর কৈলাসের কঠিন দায়িত্ব সামলে, আশ্বিনের মিষ্টি আলোয় তিনি যখন মর্ত্যের এই বাপের ভিটায় ফিরে আসেন, তখন কি তিনি আর শুধুই কোনো দেবী থাকেন? না, তখন তিনি এক পরম স্নেহের কন্যা।”
ভাবনার গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “সময়ের নিয়মে বছর ঘোরে, বয়স বাড়ে, কিন্তু বাবা-মায়ের চোখে কি তাঁর ছোট্ট খুকি কখনো সত্যিই বড় হয়? শৈশবের সেই মায়াবী হাসি, অবুঝ আবদার আর অমলিন চঞ্চলতা—মেয়ে যত বড়ই হোক না কেন, মা-বাবার কাছে সে তো সারাজীবন সেই অবুঝ শিশুটিই থেকে যায়।”
এই অনুভূতির বহির্প্রকাশ ঘটাতেই এবার সাহেবের কবরখানা সার্বজনীন পূজা কমিটির মণ্ডপে দেবীকে কোনো গম্ভীর ও ভয়াল শক্তিস্বরূপা হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসায় আগলে রাখা বাৎসল্যের সেই ছোট্ট 'উমা' রূপে আবাহন জানানো হয়েছে।
সনাতন শাস্ত্রীয় শক্তিপূজার পাশাপাশি ঘরের মেয়েকে পরম ভালোবাসায় বরণ করে নেওয়ার এই প্রাচীন ও চিরায়ত অনুভূতি এখন ছুয়ে যাচ্ছে দর্শনার্থীদের হৃদয়। চিরাচরিত রূপের বাইরে গিয়ে এমন শিশুসুলভ ও মমতাময়ী রূপ দেখে মুগ্ধ সবাই। পূজা কমিটির আহ্বান—আসুন, মহাশক্তির আরাধনার পাশাপাশি ঘরের মেয়ের প্রতি ভালোবাসার এই চিরন্তন সুরটি আমরা সবাই অন্তরে অনুভব করি।

No comments:
Post a Comment