ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মাসের পর মাস ধরে লাইভ ভিডিও ধারণ করছেন একদল চীনা নাগরিক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তাঘাট, দোকানপাট, আবাসিক এলাকা এমনকি মানুষের বাড়ির ভেতরেও ঢুকে ভিডিও করছেন তারা। প্রত্যেকের হাতে একাধিক মুঠোফোন—যার একটিতে সরাসরি সম্প্রচার, অন্যটিতে তথ্য বা লেখা। তাদের এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি বাড়ছে বিরক্তি ও উদ্বেগ।
স্থানীয়দের দাবি, উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও আশপাশের টেকপাড়া এলাকায় দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক এভাবে ভিডিও ধারণ করছেন। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব ভিডিও কোথায় প্রকাশ করা হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে ধারণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের স্পষ্ট ধারণা নেই। চীনা ভাষায় কথা বলায় তাদের বক্তব্যও বোঝেন না এলাকাবাসী।
টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘দু-এক দিনের ব্যাপার হলে হয়, কিন্তু এরা মাসের পর মাস এমন ভিডিও করে। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে তারা ভিডিও করা শুরু করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দেখি তারা ভিডিও করে। কিন্তু ভিডিওগুলো কী করে, আমরা জানি না।’
উইচ্যাট ও ডুয়িনে ভিডিও প্রকাশের দাবি
স্থানীয়দের ভাষ্য, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের ভিডিও করতে দেখা গেলেও টেকপাড়ায় তাদের উপস্থিতি বেশি। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে বেশির ভাগ চীনা নাগরিক আগ্রহ দেখাননি।
একজন বাংলাদেশি গাইড রিতু আক্তার জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করার বিনিময়ে তিনি দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পান। তার দাবি, চীনা নাগরিকেরা উইচ্যাট, ডুয়িনসহ বিভিন্ন চীনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ভিডিও প্রকাশ করেন এবং সেখান থেকে আয় করেন। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস এমন এলাকাগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি বলেও জানান তিনি।
লাইভে উত্তরাকে বলা হচ্ছে ভারতের নয়াদিল্লি
লাইভ ভিডিওতে কয়েকজন চীনা নাগরিকের বক্তব্য অনুবাদ করে দেখা যায়, উত্তরার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিডিও ধারণ করলেও কেউ কেউ লাইভে নিজেদের ভারতের নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হয়েছেন বলে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশের মানুষকে দরিদ্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং বসবাসের পরিবেশকে নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে বলে বর্ণনা করছেন। কোথাও স্থানীয় মানুষকে অবমাননাকরভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বাড়িতে ঢুকে ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চীনা নাগরিকেরা শুধু রাস্তাঘাট বা দোকানপাটেই ভিডিও করেন না, অনেক সময় আবাসিক এলাকার ভেতরে প্রবেশ করে বাড়িঘরের দৃশ্যও ধারণ করেন এবং অনুমতি ছাড়াই ঘরের মধ্যে ঢুকে ভিডিও শুরু করেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
টেকপাড়ার বাসিন্দা রোজিনা খাতুন বলেন, চীনা নাগরিকেরা মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে ঢুকে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। বাসায় সব সময় মানুষ পরিপাটি অবস্থায় থাকেন না। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কেউ ঘরে ঢুকে ভিডিও করলে তা বিব্রতকর। আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম বলেন, ভিডিও করতে করতে কেউ কেউ বাথরুমেও ঢুকে পড়েন।
পুলিশের বক্তব্য
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, ‘তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে প্রবেশ ও মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে ভিডিও ধারণের ঘটনা বন্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পণ্যের প্রচারণার জন্য ভিডিও করা হচ্ছে বলে দাবি করলেও ভিডিওতে এলাকার পরিচয় ও মানুষকে নিয়ে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

No comments:
Post a Comment