শরতের আকাশে উৎসবের রং আর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গাকে বরণের শেষ প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় রং-তুলির শেষ আঁচড়, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও তোরণ সাজানোর কাজ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠার অপেক্ষায় মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো। মহালয়ায় দেবীকে আবাহনের পর বৃহস্পতিবার পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধন সম্পন্ন হয়েছে। আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
তিথি অনুযায়ী, আজ মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তদের প্রার্থনা, পূজা-অর্চনা ও নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপগুলো। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঘোড়ায় আগমনের ফল হিসেবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ ও শস্যহানির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নৌকায় গমনের ফল হিসেবে শস্যবৃদ্ধি ও জলপ্লাবনের ইঙ্গিত রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, গত বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে। তবে ঢাকা মহানগরীতে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত বছর ২৬১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার হচ্ছে ২৫৮টিতে।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়। তবে এবার মহাসপ্তমীর তিথি দুই দিন পড়ায় পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছয় দিন ধরে চলবে। সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল শনিবার মহাসপ্তমী, রোববার অধিক তিথিতে মহাসপ্তমীর পূজা, সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনে সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকরা নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবেন। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হচ্ছে।
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, দেবী দুর্গার প্রতিমা সাজানো ও রং করার কাজ চলছে শেষ মুহূর্তে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ওপরও তৈরি করা হচ্ছে পূজামণ্ডপ। উৎসবকে ঘিরে পূজা কমিটির সদস্যদের মধ্যে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি থাকছে।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তায় বিজিবি-এসআরবি-পুলিশ, আনসার
শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১ হাজার ৮০০ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। নাশকতা ও যেকোনো অপতৎপরতা মোকাবিলায় মাঠে রয়েছে এসআরবি। বিভাগীয় শহরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এর পাশাপাশি সারা দেশের পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালন করছেন ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী জানান, সীমান্তের দুর্গম এলাকায় ১৮টি বেসক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
এসআরবি মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ জানান, ১৫টি ব্যাটালিয়নের ৬ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়কে প্রতিদিন ৫৪৯টি পিকআপ ও ৪৪৭টি মোটরসাইকেলে টহল দেওয়া হচ্ছে।
আনসার-ভিডিপি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, ১৫ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পূজামণ্ডপগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮৮ জন পুরুষ ও ৬৬ হাজার ৩৩০ জন নারী সদস্য। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ জন সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রথমবারের মতো ‘দুর্গাপূজা বিশেষ বাস সার্ভিস’ চালু করছে বিআরটিসি। ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিশেষ বাস সার্ভিস পরিচালিত হবে। এ জন্য ২০০টি বাস প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

No comments:
Post a Comment