মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম চম্পা নাইডুর। চা-বাগানের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই বেড়ে ওঠা সেই চম্পাই এখন ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। তার গবেষণার বিষয় বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবন, মানবাধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা।
চম্পার শিক্ষাজীবনের শুরু চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য পরিচালিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে। ২০১০ সালে সেখানে ভর্তি হওয়ার পর বিনামূল্যে পড়াশোনা ও আবাসনের সুযোগ পান তিনি। ২০১৫ সালে ক্যামেলিয়া ডানকান হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে কুলাউড়ার ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
উচ্চশিক্ষার পথেও বৃত্তি তার এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম সহায়তা হয়ে ওঠে। ডাচ্-বাংলা ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি নিজের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও চা-শ্রমিকদের জীবনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা চম্পার চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। চা-শ্রমিকদের শিক্ষা, অধিকার, জীবনমান ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয় তার মধ্যে।
২০২৩ সালে ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (ICCR) স্কলারশিপ নিয়ে ভারতে যান চম্পা। এরপর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। নিজের পূর্বপুরুষদের শেকড় অন্ধ্র অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
২০২৫ সালে আবারও ICCR স্কলারশিপ অর্জন করেন চম্পা। একই বছর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি গবেষক হিসেবে ভর্তি হন। এর আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে নিজের শেকড়ের টানে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে তার গবেষণার সময়কাল ২০২৫ থেকে ২০২৮ সাল। গবেষণায় বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবনযাপন, মানবাধিকার ও সামাজিক বাস্তবতার পাশাপাশি তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিমালার মাধ্যমে কীভাবে চা-শ্রমিকদের জীবনমান ও সামাজিক মর্যাদা উন্নত করা সম্ভব, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লংলা চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে এসে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পাওয়ায় চম্পা এখন নিজ এলাকার মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার নাম। বিশেষ করে চা-বাগানের শিশু-কিশোরদের কাছে তার শিক্ষাজীবনের সাফল্য নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছে।
চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণার সুযোগ পাওয়া চম্পা নাইডুর পথচলা তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং সীমিত সুযোগের মধ্যেও শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার একটি উদাহরণ।

No comments:
Post a Comment