বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Monday, June 22, 2026

AI যেভাবে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার

সিউল থেকে: দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের একটি প্রযুক্তি গবেষণাগারে কর্মরত অবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নীরব বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখছি। এখানে এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি অর্থনীতি, শিক্ষা ও জনসেবার প্রধান চালিকাশক্তি। দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে অফিসের কাজ— সবখানেই এআই গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও প্রথাগত অনেক চাকরির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে চাইলে ডিগ্রির পাশাপাশি এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে দক্ষ করে তোলার বিকল্প নেই।
সিউলের রাস্তায় বের হলেই বোঝা যায় প্রযুক্তি কতটা জীবনে মিশে গেছে। ফোনে আগেভাগেই জানা যায় কোন বাস কত মিনিটে আসবে, কতটা ভিড় হবে, গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগবে কতটুকু। ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে অনলাইন শপিং— সবখানেই এআই যেন গ্রাহকের মনের কথা পড়তে পারে। অফিসে এখন নীরবে ঢুকে পড়েছে এক নতুন সহকর্মী, যার কোনো বেতন-ভাতা নেই, ছুটিও লাগে না। তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগে যে খসড়া, ই-মেইলের জবাব বা কোড তৈরি করতে তিনজনের এক বিকেল লাগত, এখন এআইয়ের সহায়তায় তা একাই গুছিয়ে নিচ্ছেন একজন কর্মী, সময় লাগছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে ২২ শতাংশ বড় পরিবর্তন আসবে; প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হতে পারে, তবে নতুন করে ১৭ কোটি কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৩৯ শতাংশ চাকরির দক্ষতা পুরোপুরি বদলে যাবে। আইএমএফ বলছে, বিশ্বের ৪০ শতাংশ চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব পড়বে। লিঙ্কডইনের জরিপ বলছে, ৭৫ শতাংশ কর্মী ইতোমধ্যে কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন, আর ৬৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা এখন এআই দক্ষতাকে চাকরির পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আরও বেশি সংবেদনশীল। বছরে প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ১৪ শতাংশ। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে টেমপ্লেট-নির্ভর সাধারণ কাজে মূল্য কমে যাবে, তবে বাংলা ভাষার লোকালাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্লায়েন্ট সমস্যা বোঝার মতো কাজে নতুন দ্বার খুলবে। শিক্ষা ও প্রশাসনিক চাকরিতেও একই দ্বৈততা দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি দক্ষতা কেবল এআই টুল চালানো নয়, বরং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, তথ্য যাচাই, যোগাযোগ, নৈতিক বোধ এবং নিজের কাজের গভীর জ্ঞান। মাইক্রোসফটের গবেষণাও বলছে, এআই-যুগে মান নিয়ন্ত্রণ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মানবিক দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়বে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষায় এআইয়ের নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতে এআই ব্যবহার ও জালিয়াতি শনাক্তে কাজ করছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বৈষম্য দূর করা। জাতীয় বাংলা ভাষা মডেল গড়ার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়ে জরুরি শিক্ষক, ব্যাংকার, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মী ও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত পুনঃদক্ষতাকরণ।
সামনের দিনের প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মেশিন নয়; এআই-সচেতন মানুষ বনাম এআই-অসচেতন মানুষের মধ্যে। ভয় নয়, প্রস্তুতিই হবে টিকে থাকার একমাত্র পথ। বাংলাদেশের সামনে এখন কাজ— দ্রুত দক্ষতা বৃদ্ধি, গবেষণা জোরদার করা, বাংলাভিত্তিক ডিজিটাল অবকাঠামো গড়া এবং কার্যকর নীতিমালা তৈরি। নইলে এআই আমাদের জন্য সুযোগের চেয়ে বৈষম্যের যন্ত্রই হয়ে উঠবে।

No comments:

Post a Comment

"
"