কপোতাক্ষ নদের পাশে কাশির হাটখোলায় ছোট্ট এক মিষ্টির দোকান। কাচের বাক্সে সাজানো রসগোল্লা, চমচম, কালোজামের পাশে দোকান সামলাচ্ছেন হিরা মণ্ডল (৩০)। ছয় বছর আগের ভয়াবহ সেই ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি মনে করেই হেসে বললেন, "নতুন করে শুরু করছি সব।"
হিরার এই দোকান শুধু মিষ্টি বিক্রির জায়গা নয়, এটি এক তিক্ত সংগ্রামের প্রতীক। খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাশির হাটখোলা একসময় কপোতাক্ষ নদের ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। সেই হাটে হিরা ও তার স্বামী বিশ্বজিৎ মণ্ডলের ছিল ছোট্ট মিষ্টির দোকান আর বসতভিটা। স্বপ্ন ছিল, একদিন দোকানে ছানার রসগোল্লা, সন্দেশও বিক্রি হবে।
কিন্তু ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পান কপোতাক্ষের সেই স্বপ্ন কেড়ে নেয়। প্রবল বাতাসে উড়ে যায় টিনের চাল, ভেঙে পড়ে দোকানের বেড়া। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় ভিটেমাটি।
হিরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, "চোখের সামনে সব শেষ হইয়ে গেল। মেয়েডারে নিয়ে শুধু প্রাণটা বাঁচাইছিলাম।" পাঁচ বছরের মেয়ে পূজাসহ পরিবার আশ্রয় নেয় বেড়িবাঁধের ওপর। সেখানেই তাঁবু খাঁটিয়ে চলে অনিশ্চিত জীবন।
সব হারানোর পর হিরা থেমে থাকেননি। স্বামী ভ্যান চালালেও সংসার চালাতে তিনি নেমে পড়েন কপোতাক্ষের নোনা পানিতে, নেট দিয়ে ধরতেন বাগদার পোনা। কিন্তু মনের ভেতর মিষ্টির দোকানের স্বপ্নই বড় হয়ে ফিরে আসে। সমস্যা ছিল, তিনি ছানার মিষ্টি বানাতে জানতেন না। তাই একদিন পাশের এলাকার এক প্রবীণ কারিগরের কাছে গিয়ে বিনা পয়সায় কাজ শেখার প্রস্তাব দেন। হিরার ভাষায়, "উনি বললেন, টাকা দিতি পারব না। আমি বললাম, টাকা লাগবি না, শুধু কাজ শিখাই দেন।" সেভাবেই শেখা হয় রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম তৈরির কৌশল।
গত বছর আবার দোকান গড়ে তোলেন তারা। এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করা এই দোকানে এখন স্বামী-স্ত্রী মিলেই কাজ করেন। প্রতি মাসে কিস্তি তিন হাজার টাকা। হিরা বলেন, "যেদিন বিক্রি কম, সেদিন গাঙে নামতি হয়। স্বামীও মাঝেমধ্যি দিনমজুরি করে। বসে থাকলি চলে না।"
কিন্তু নতুন দুশ্চিন্তা এখন তার বুকে ধরা পড়া টিউমার। বললেন, "ওষুধ শেষ, আবার ডাক্তার দেখাতি হবে।" পাশাপাশি খাসজমিতে গড়া এই ঘরদোর যে কোনো দিন সরাতে হতে পারে, সেই আতঙ্কও তাড়া করে বেড়ায়।
তবু স্বপ্নপূরণের আশায় বুক বেঁধেছেন হিরা। তার ইচ্ছা, সন্তানেরা যেন লেখাপড়া শিখে তার মতো কষ্ট না করে। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে পাশে পাওয়া মানুষের ভালোবাসার কথাও ভোলেননি তিনি। বলেন, "মেয়ের জন্মের সময় সবাই— হিন্দু-মুসলমান— এগিয়ে আসছিল।"
স্থানীয় শিক্ষক মিহির কান্তি মণ্ডল বলেন, "কপোতাক্ষ হিরার সব কেড়ে নিয়েছে, তবু তিনি থেমে যাননি। তার দোকান এখন শুধু জীবিকা নয়, দুর্যোগে মাথা তোলার এক নারীর প্রতীক।"
.jpeg)
No comments:
Post a Comment