বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Wednesday, July 29, 2026

পবিত্র গুরুপূর্ণিমা আজ: জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত সনাতন বিশ্ব

আজ পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও পুণ্যময় তিথি গুরুপূর্ণিমা বা ব্যাসপূর্ণিমা। এই শুভদিনেই আবির্ভূত হন জগদ্গুরু, মহর্ষি শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস, যিনি মানবসভ্যতার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। তাঁর অসামান্য অবদানের কারণেই তিনি "বেদব্যাস", "ব্যাসদেব" এবং "জগদ্গুরু" নামে সমগ্র সনাতন জগতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
সনাতন শাস্ত্র মতে, ঋষি পরাশর ও দেবী সত্যবতীর পুত্র বেদব্যাস উপলব্ধি করেছিলেন যে, কলিযুগে মানুষের স্মৃতিশক্তি, অধ্যবসায় ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের শক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হবে। তাই তিনি অনন্ত বৈদিক জ্ঞানকে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে সুসংগঠিত করে চার ভাগে বিভক্ত করেন। ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ পৃথকভাবে তাঁর প্রধান শিষ্যদের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও প্রচারিত হয়। এর মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় গুরু-শিষ্য পরম্পরার সেই চিরন্তন ভিত্তি, যা হাজার হাজার বছর ধরে সনাতন ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকে বহমান রেখেছে।

ব্যাসদেব কেবল বেদের সংকলকই নন, তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহাকাব্য মহাভারত রচনা করেন। এই মহাকাব্যের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মানবজাতির জন্য এক অনন্ত আধ্যাত্মিক পথনির্দেশিকা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত গীতার অমৃতবাণী যুগে যুগে অসংখ্য মানুষকে ধর্ম, কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির সঠিক পথ দেখিয়ে আসছে। এছাড়াও ব্রহ্মসূত্র, আঠারোটি মহাপুরাণ এবং আঠারোটি উপপুরাণ রচনার কৃতিত্বও ঐতিহ্যগতভাবে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত।সনাতন দর্শনে গুরুর স্থান ঈশ্বরের পরেই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, "গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ। গুরুসাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।" অর্থাৎ গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু, গুরুই মহেশ্বর এবং গুরুই পরব্রহ্মের প্রকাশ। তিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেন এবং শিষ্যকে আত্মোপলব্ধি ও ঈশ্বরচেতনার পথে পরিচালিত করেন।ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতে, গুরুপূর্ণিমা শুধু দীক্ষাগুরুকে প্রণাম করার দিন নয়, বরং জীবনের প্রতিটি শিক্ষক, আচার্য, উপদেষ্টা ও জ্ঞানদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও এক মহাপবিত্র তিথি। পরিবারে পিতা-মাতা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিল্প-সংস্কৃতির গুরু কিংবা যে কোনো ব্যক্তি যিনি জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো ছড়ান, সকলেই এই দিবসে শ্রদ্ধা ও সম্মানের দাবিদার।বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে মঠ-মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পূজা, গুরুপূজা, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ, বেদপাঠ, ভাগবত আলোচনা, হরিনাম সংকীর্তন, ধর্মসভা, ভজন-কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ এবং দান-ধ্যানের আয়োজন করা হয়েছে। ভক্তরা গুরুদেবের চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে আশীর্বাদ গ্রহণ করছেন এবং সত্য, ধর্ম, শুদ্ধাচার ও আত্মউন্নয়নের পথে জীবন পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করছেন।সনাতন ধর্মে প্রকৃত গুরু কখনো ব্যক্তিপূজার শিক্ষা দেন না; তিনি শিষ্যকে ভগবানের শরণাগত হতে, শাস্ত্রসম্মত জীবনযাপন করতে, সকল প্রাণীর প্রতি দয়া, সত্যনিষ্ঠা ও মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। গুরু শিষ্যের অন্তরের অজ্ঞানরূপী অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের সূর্যোদয় ঘটান। তাই গুরুপূর্ণিমা মূলত জ্ঞান, ভক্তি, বিনয়, আত্মশুদ্ধি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে পুনরায় ধারণ করার এক মহিমান্বিত আহ্বান।

No comments:

Post a Comment

"
"