১৯৮৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামে শশাঙ্ক দেবনাথ নামের এক দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী নিখোঁজ হন। দু’বছর পর উধাও হয়ে যান তার স্ত্রী বিরজাবালা ও পাঁচ সন্তান। গ্রামে গুজব ছড়ায়, শশাঙ্ক আগেই ভারতে চলে গেছে এবং স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি ঘটনা ছিল আরও ভয়াবহ।
১৯৮৯ সালের একদিন বিকেলে গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক ধোপাজুড়ি বিলে নৌকায় যাওয়ার সময় পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। পরে মাঝি বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচা দিলে একটি ড্রাম ভেসে ওঠে। ড্রাম খুলতেই সবাই স্তব্ধ—ভেতরে তিনটি লাশ। পরবর্তীতে আরেকটি ড্রাম পাওয়া যায়, সেখানে আরও তিনটি লাশ। মোট ছয়টি লাশ—যারা আর কেউ নন, শশাঙ্কের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। বেঁচে যান শুধু এক মেয়ে সুনীতিবালা, যিনি তখন শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, প্রতিবেশী গ্রামের কসাই তাজুল ইসলাম শশাঙ্কের সম্পত্তি দখলের লোভে প্রথমে শশাঙ্ককে অপহরণ করে হত্যা করেন। পরবর্তীতে তার স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকেও এক রাতে নৌকায় তুলে নিয়ে বিলের মাঝে হত্যা করে ড্রামে চুন ও লবণ দিয়ে ভরে বিলে ফেলে দেওয়া হয়। নিহতদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাজুল ইসলাম জানায়, ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে সহযোগীদের নিয়ে সে এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। রাতে তারা দুই নৌকায় শশাঙ্কের বাড়িতে যায়। ঘরের জানালার রড বাঁকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত অবস্থায় বিরজাবালা ও তার সন্তানদের ধরে নৌকায় তুলে নেয়। বিলের মাঝে রামদা দিয়ে একে একে সবার দেহ দ্বিখণ্ডিত করে ড্রামে ভরে চুন-লবণ দিয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
শশাঙ্ককে হত্যার পদ্ধতিও ছিল নৃশংস। তাজুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা শশাঙ্ককে ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ফাঁদে ফেলে এক ঘরে গামছার ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে এবং লাশ ভারতের একটি পরিত্যক্ত রিফিউজি ক্যাম্পে ফেলে আসে।
এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারে তাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের ফাঁসির রায় হয়। ফাঁসি কার্যকরের পর ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। তাজুলের লাশ কারাগার থেকে বের করার সময় ক্ষুব্ধ মানুষ থুতু ছিটিয়ে ও জুতা নিক্ষেপ করে তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে।
৩৮ বছর আগের এই ঘটনা এখনো এলাকার মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে আছে। এই ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয়।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment