বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Saturday, August 29, 2026

পাবনার চাটমোহরে কুপি-হারিকেনের আলোয় ফিরে এল পুঁথি পাঠের ঐতিহ্য

বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করা গ্রামবাংলার রাতে যেন ফিরে এল বহু বছর আগের সেই চেনা দৃশ্য। পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারা পাড়া গ্রামে বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাতে বসেছিল ঐতিহ্যবাহী পুঁথি পাঠের আসর। হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতির এ আয়োজন দেখতে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ।

উঠানে কুপি ও হারিকেনের আলো, মাটিতে বিছানো হোগলা পাটি আর চারপাশে গোল হয়ে বসা মানুষ—কারও হাতে মোবাইল নেই, নেই টেলিভিশনের শব্দ। সবার মনোযোগ পুঁথি পাঠে। বিলুপ্তপ্রায় এই লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক ডা. এস এম আতিকুল আলম বলেন, ‘পুঁথি পাঠ গ্রামবাংলার বহু পুরোনো লোকঐতিহ্য। একসময় সারাদিনের কাজ শেষে গ্রামের মানুষ পুঁথি পাঠের আসরে জড়ো হতেন। শিল্পীদের কণ্ঠের সুরে গল্প শুনে তারা বিনোদনের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও পেতেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। পুরোনো দিনের সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই আয়োজন।’

সেদিন কুপি ও হারিকেনের আলোয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল পাঠ করেন কালজয়ী পুঁথি ‘হানিফ পালোয়ান ও বিবি সোনাভান’। পরে ঐতিহ্য সংগ্রাহক মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক শোনান ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’র গল্প।

বিভিন্ন বয়সের মানুষ মাটিতে পাটি বিছিয়ে উপভোগ করেন পুঁথি পাঠ। অনেকের কাছেই এটি ছিল পুরোনো দিনের গল্প শোনার সুযোগ, আবার তরুণদের জন্য ছিল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা।

বাংলা পুঁথি সাহিত্যের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। সপ্তদশ শতকের শেষভাগ ও অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে কবি ফকির গরিবুল্লাহর ‘আমির হামজা’ পুঁথির মাধ্যমে এ ধারার চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে। পুঁথি সাহিত্যে আরবি, ফারসি ও স্থানীয় ভাষার মিশ্রণ তৎকালীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

চাটমোহরের সমাজসেবক এসএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে পুঁথি পাঠের মতো লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামেই পুঁথি পাঠের আসর বসত। এখন সেই পাঠকও পাওয়া যায় না। তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া দরকার।’

আসরটি আয়োজন ও সমন্বয়ে ছিলেন সজল বিশ্বাস, বিপ্লব আচার্য, নিয়মুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুন্ডু ও শুভ কর্মকার। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হারিয়ে যেতে বসা পুঁথি পাঠ যেন কেবল এক রাতের আয়োজন না হয়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত এমন আসর বসুক এবং নতুন প্রজন্ম জানুক তাদের শিকড়ের গল্প, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা।

No comments:

Post a Comment

"
"