বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Sunday, August 30, 2026

নেপালের ভয়াবহ বন্যা থেকে ‘অলৌকিকভাবে’ বেঁচে ফিরলেন ভারতের ২১ তীর্থযাত্রী

তিব্বত-নেপাল সীমান্তের পাহাড়ি পথ যখন আকস্মিক বন্যা ও ধসে পড়া পাথরের নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন কাদা-মাখা পাহাড়ের ওপর থেকে নামিয়ে দেওয়া একটি সাধারণ শাড়িই হয়ে উঠেছিল একদল প্রবীণ তীর্থযাত্রীর জীবন বাঁচানোর একমাত্র অবলম্বন। নেপালে তীর্থযাত্রায় গিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে মৃত্যু আতঙ্ক থেকে ফিরে এসেছেন ভারতের তামিলনাড়ুর ২১ জন তীর্থযাত্রী। তাদের বহনকারী তিনটি বাসের মধ্যে দুটি বন্যার তোড়ে ভেসে গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরেছেন তারা।

চেন্নাইয়ের ভেলাচেরি এলাকার বাসিন্দা নাভু কবিরদাস ও তার স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী জানান, তাদের মনে হচ্ছে তারা যেন ‘নতুন জীবন’ ফিরে পেয়েছেন। এই দম্পতি তামিলনাড়ুর কুম্বকোনম-ভিত্তিক একটি এজেন্সির মাধ্যমে তিনটি বাসে করে মোট ৫৭ জনের দলের সঙ্গে নেপালের রাসুয়া জেলা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের বহরের দ্বিতীয় বাসটি কাদায় আটকে যাওয়ায় মেরামতের জন্য কয়েক মিনিট থামতে হয়েছিল। ভুবনেশ্বরী বলেন, ওই কয়েক মিনিটের যাত্রাবিরতিই মূলত তাদের জীবন বাঁচিয়েছে।

নাভু কবিরদাস বলেন, ‘হঠাৎ করেই আমরা বোমার মতো বিকট শব্দ শুনতে পাই এবং আমাদের গাড়ির ওপর বড় বড় পাথর পড়তে শুরু করে। ঠিক তখনই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মতো তীব্র বেগে বন্যার পানি ধেয়ে আসতে শুরু করে।’

ভুবনেশ্বরী জানান, তিনি চোখের সামনে তাদের ঠিক পেছনের বাসটিকে কাত হয়ে কাদার মধ্যে ডুবে যেতে দেখেছিলেন, যা দেখার মতো সাহস তার ছিল না। বিপদ আঁচ করতে পেরে তাঁদের নেপালি চালক সবাইকে বাস থেকে নেমে পাহাড়ের ওপরের দিকে দৌড়ানোর নির্দেশ দেন এবং গাড়ি ফেলে পালিয়ে যান। যাত্রীরাও চালককে অনুসরণ করেন।

বেঁচে যাওয়া ২১ জন তীর্থযাত্রীর বেশিরভাগেরই বয়স ৫০ বছরের বেশি। তাদের প্রায় এক তলা সমান উঁচু এবং পিচ্ছিল কাদার পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হয়েছিল। ওঠার সময় বারবার তারা পা পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় পুঙ্গোদি নামের দলের এক নারী কোনোমতে পাহাড়ের ওপরে উঠে তার পরনের সোয়েটারটি গায়ে জড়িয়ে নেন এবং নিজের শাড়িটি খুলে নিচে আটকে থাকা অন্য যাত্রীদের দিকে দড়ির মতো ঝুলিয়ে দেন।

ভুবনেশ্বরী বলেন, ‘আমরা সেই শাড়ির আঁচল এবং সেখানে ঝুলে থাকা একটি লোহার তার শক্ত করে ধরে ওপরে উঠি। সবশেষে এক নারী কোনোভাবেই ওপরে উঠতে পারছিলেন না। আমরা তাকে শাড়িটি কোমরে শক্ত করে বাঁধতে বলি এবং ওপরে থাকা সবাই মিলে শাড়িটি টেনে তাকে সরাসরি ওপরে তুলে আনি।’

কাঞ্চিপুরম জেলার এক পঞ্চায়েত ইউনিয়ন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাথ্য জানান, সকাল ৮টায় তারা চীনের ইমিগ্রেশনের উদ্দেশে সিয়াব্রুবেসি ত্যাগ করেছিলেন। হঠাৎ তারা আকাশে ধুলার এক বিশাল মেঘ দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট বা সাত-আট তলা উঁচু সুনামি তরঙ্গের মতো পাথর আর কাদার পাহাড় আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। আমরা আজীবন কেবল ইংরেজি সিনেমাতেই এমন দৃশ্য দেখেছি।’

পাহাড়ে ওঠার কোনো রাস্তা ছিল না। তারা চার ফুট ওপরে উঠলে পিছলে পাঁচ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছিলেন। অবশেষে তারা একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছান এবং সেখান থেকে পরিবারের কাছে বেঁচে থাকার খবর পাঠান।

৫৭ জনের বহরের বাকি ৩৬ জন যাত্রীর সঙ্গে এখনও কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া চীনের তিব্বতের গিরিয়ং পোর্ট ইমিগ্রেশন ভবনের ভেতরে থাকা চেন্নাইয়ের অন্য দলের ৪৯ জন তীর্থযাত্রী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহন জানান, তামিলনাড়ু থেকে চার শতাধিক মানুষ নেপালে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৯০ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

বেঁচে ফেরা তীর্থযাত্রীরা নেপাল সরকার, নেপাল সেনাবাহিনী, ভারতীয় দূতাবাস এবং তামিলনাড়ু সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য সত্যিই এক অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য যাত্রা ছিল।’

No comments:

Post a Comment

"
"