বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ


Breaking

Saturday, July 25, 2026

'আইনের সীমাবদ্ধতা এবং হিন্দু বিয়ের গ্যাঁড়াকল'

বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদের আইনি পথ আজও কার্যত রুদ্ধ। ধর্মীয় আইনের জটিলতায় বিবাহবিচ্ছেদের সুস্পষ্ট কোনো বিধান না থাকায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী পারিবারিক অত্যাচার ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কোলি রায় (ছদ্মনাম) নামের এক নারী চিকিৎসকের জীবনযাত্রা সেই বাস্তবতারই দর্পণ।

পেশায় একজন সফল চিকিৎসক কোলি রায়ের সঙ্গে ২০০৯ সালে দেশের এক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুজন শুভ্রর (ছদ্মনাম) সঙ্গে বিবাহ হয়। তবে বিবাহের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। পারিবারিক বিরোধের এক পর্যায়ে সুজন শুভ্র সংসার করতে অস্বীকৃতি জানান, অন্যদিকে তিনি আইনি বিচ্ছেদেও সম্মত হননি। এর ফলে কোলি রায় আইনি লড়াইয়ে নামলেও ১৯৪৬ সালের হিন্দু অবিবাহিতা নারীদের পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণ আইনে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধান না থাকায় তিনি আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন।

বর্তমানে কোলি রায় তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একা বসবাস করছেন এবং দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা এই বিবাহবন্ধন থেকে মুক্তি চাইছেন। তিনি জানান, স্বামী সংসারেও রাজি নন, আবার বিচ্ছেদেও রাজি নন—যার ফলে তিনি সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় পড়েছেন।

আইন কী বলে?
১৯৪৬ সালের আইনে একজন হিন্দু নারী স্বামীর অত্যাচার, পরিত্যাগ বা দ্বিতীয় বিবাহের মতো কিছু বিশেষ শর্তে পৃথক বসবাসের আবেদন করতে পারেন। তবে এই আইনে কোনো স্থায়ী বিবাহবিচ্ছেদের বিধান নেই। ২০১২ সালে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন’ প্রণীত হলেও তা ঐচ্ছিক রাখায় এর বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। ফলে বিবাহবিচ্ছেদ বা পুনর্বিবাহের আইনি সুযোগ থেকে হিন্দু নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদাহরণ:
ভারতের ‘হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫’, নেপালের ‘দেওয়ানি আইন, ২০১৭’ এবং শ্রীলঙ্কার বিবাহ সংক্রান্ত আইনে হিন্দু নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট বিধান থাকলেও বাংলাদেশে এই সংস্কার এখনো হয়নি।

আদালতের ভূমিকা ও পরবর্তী করণীয়:
২০২৩ সালে নয়টি মানবাধিকার সংগঠন হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে হিন্দু নারীদের বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও অভিভাবকত্বের অধিকার নিশ্চিত করতে আইনি নির্দেশনা চায়। হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও আইনি শূন্যতার কারণে হাজারো হিন্দু নারী প্রতিদিন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধিবদ্ধ ‘হিন্দু বিবাহ আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে তা সুরক্ষিত করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন আইনবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা।


 

No comments:

Post a Comment

"
"